অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধানসহ ৫ উপদেষ্টার শ্রদ্ধাঞ্জলীতে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক
দিন পঞ্জিকার পাতায় আজ ১ সেপ্টেম্বর। বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক এর ১৬তম মৃত্যু বার্ষিকী। তিনি একাধারে প্রকৌশলী, নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তারই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফসল আজকের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর- এলজিইডি।
বিদ্যুৎ, পানিসহ বহু খাতেই বিপ্লব ঘটিয়েছেন তিনি। রাবার ড্যাম দিয়ে কৃষির পানি ধরে রক্ষে প্রলঙ্করি বন্যা ঠেকানোর প্রকৌশলী ধারণা ছিলো তারই প্রকৌশল জ্ঞানের স্বাক্ষর। তাকে গ্রামীণ অবকাঠামোর রূপকার বলা হলেও তিনি ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে অল্পদিনেই তিনি ঢাকা শহরের বিধ্বস্ত আইল্যান্ড, জীর্ণ ফুটপাত, অবৈজ্ঞানিক ট্রাক, দুর্বল সিগন্যাল ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় গোলচক্কর, নিয়ন বাতির স্বল্পতা এসব সমস্যা সমাধানে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ‘জিআইএস’ ও ‘জিপিএস’ বিপ্লবের প্রথম প্রহরেই বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলেন ‘ডিজিটাল ম্যাপিং’। আজকের মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ছিলো তারই নকশাকৃত ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের (ডিটিসিবি) কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) । কিন্তু তিনি ব্যক্তিবন্দনার ব্রাকেট বন্দী ছিলেন না। দলীয় ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগের জনপ্রিয় উদ্যোক্তা ‘কিউআইএস’ হিসেবেই ছিলেন সমধিক পরিচিত। ছিলেন নিভৃতচারী ব্যতিক্রমী সরকারী আমলা। কর্মীদের কাছে ‘বড় স্যার’ হয়েও আমৃত্যু খেটেছেন কামলার মতো। পুরো জীবনটাই বরবাদ করেছেন দেশের উন্নয়ন প্রকৌশল জ্ঞান প্রয়োগে। তিনি কেবল স্বপ্নদ্রষ্ট্রাই ছিলেন না, ছিলেন স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারিগরও।
সে কারণেই দেশে বোর্ড অব অ্যাক্রিডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন এর বিকাশে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ- আইইবি-কে শক্ত ভীতের ওপর দাঁড় করিয়ে তিনি দেশের প্রকৌশল খাতে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন জীবদ্দশাতেই। ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে তার সুদূর প্রসারী বিশেষজ্ঞ ভাবনা তাক লাগিয়েছে বিশ্বকে। তার বহু কীর্তি সারাদেশের গ্রামে আর শহরে রয়ে গেছে, বহু যুগ ধরে থাকবে। এসব করতে গিয়ে তিনি অনেকের চক্ষু-শূল হয়েছেন। তবে মাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি পান করানোর মোতো কূটনৈতিক ধী-শক্তি ছিলো তার প্রখর। ফলে তার সময়ে বিশ্বব্যাপী তিনি খ্যাতি অর্জন করেন সহজেই। রাষ্ট্র ও সরকারের সীমা রেখায় তিনি ছিলেন নাছোর বান্দা। তাইতো সময়ের নিয়মে সরকার বদলালেও নিজ অবস্থানে অনঢ় থেকেছেন; হেটেছেন ঋজু পথে; নত হননি, আপোস কিংবা তেলবাজিও করেননি। ভালোবেসে এগিয়ে গেছেন দুর্গম পথ। কঠীনেরে ভালোবেসে করেছেন কোমল।
স্বৈরশাসক, তত্ত্বাবধায়ক এমনকি গণতান্ত্রিক প্রতিটি সরকারই তার কাজে মুগ্ধ ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার কাঠামো’র মিলেমিশে একাকার অবস্থার কারণে আজো তিনি দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা থেকে বঞ্চিত। বিশ্বব্যাংক থেকে ‘ম্যাজিক বয়’ খেতাব পেয়েও জাতীয় কোনো পদকে ভূষিত করা হয়নি তাকে; যেমনটি নোবেল জয়ী হয়েও মেলেনি বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের ক্ষেত্রে।
তবে নোবেল বিজয়ী হওয়ার এই জ্যোতির্ময়ের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলী পাঠিয়েছিলেন ড. ইউনুস। তাতে তিনি লিখেছিলেন- ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও কেবলমাত্র প্রবল আগ্রহ ও নিষ্ঠার দ্বারা তিনি (কিউআইএস) স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ স্থাপন করে প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা আর ত্যাগ থাকলে দেশের জন্য বড় কোন অবদান রাখার ক্ষেত্রে কোন কিছুই বাধা হতে পারে না। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি যে মডেল সৃষ্টি করেছেন তা শুধু বাংলাদেশে নয়, তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ জনপদের জীবন-মান উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক অবদান রেখেছে’।
ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানের বৈষম্য দূরিকরণের কাঠামোগত উন্নয়নের অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন, ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, ড. আসিফ নজরুল এবং সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান শ্রদ্ধাঞ্জলী জানিয়েছেন এই কর্মবীরের।
২০০৮ সাল তাঁর মৃত্যুতে ‘হতবাক’ হওয়া অন্তর্বতীকালীন সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তিনি ছিলেন বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে অত্যন্ত বিজ্ঞ ব্যক্তি, ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, দক্ষ ব্যবস্থাপক- সব মিলিয়ে একজন নিষ্ঠাবান, নিবেদিতপ্রাণ নিরলস কর্মী।.... কথা ও কর্মের (তার মতো) এমন কার্যকর সংমিশ্রণ সচারচর দেখা যায় না।.. জনাব সিদ্দিক তাঁর কর্মে ও মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহারের জন্য আমাদের স্মৃতিতে থাকবেন চির অম্লান।’
প্রভাবশালী উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, “পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি চাকুরে হয়েও কামরুল ইসলাম সাহেব এদেশের মানুষের মনের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন। রেখে গেছেন সারা বাংলাদেশে তাঁর অসংখ্য কীর্তি। .... জনাব কামরুল ইসলামের অক্লান্ত পরিশ্রমে শুধু গ্রামীণ অবকাঠামোগুলোর পরিবর্তন, পরিবর্ধন আর সম্প্রসারণ হয়নি, এসব অবকাঠামোর কারেণে গ্রামীণ অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। খামার হতে বাজার পর্যন্ত যোগাযোগের অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষক তার পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পেতে শুরু করে। তিনি শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্যে পানি সংরক্ষণেরও ব্যবস্থাপনার উন্নতিকল্পে 'রাবার বাঁধ' বা Rubber Dam স্থাপন করে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন। জেলা-উপজেলার Base Map তৈরিকল্পে বাংলাদেশে Geographic Information System (GIS) চালু করেন । GIS শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি, এর ব্যাপক ব্যবহার বাংলাদেশের প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে। এমনকি ২০০৮ সালে সমগ্র দেশে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের জন্যেও প্রাথমিকপর্যায়ে GIS-এর তথ্য এবং System ব্যবহার করা হয়েছিল—যার কারণে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। জনাব কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের কর্মময় জীবনের ইতিবৃত্ত একজন সফল মানুষের সকল প্রাপ্তিতে ভরা। তিনি শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে পরিচিত করে তুলতে অক্লান্ত নিঃস্বার্থভাবে পরিশ্রম করেছেন।”
নগর ও আমালিক পরিকল্পনাবিদ হিসেবে শুধু না, তা বাস্তবায়নে তার সাংগঠনিক ক্ষমতা, নেতৃস্থানীয়
ভূমিকা ও নিরলস আন্তরিকতা ছিল অতুলনীয়। তিনি গ্লোন ওয়াটার পার্টনারশিপের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ... আন্তর্জাতিক নদী আইন সম্পর্কিত বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনি যে কোন আন্তর্জাতিক ফোরানে
জোরালো বক্তব্য রাখতেন, আমাদেরকেও সর্বাত্মকভাবে উৎসাহিত করতেন। তার গভীর পাণ্ডিত্য এবং নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞরা তাকে যে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখতো তা উপলব্ধি করে আমরা নিজেরা সম্মানিতবোধ করতাম।... নানা মত ও পথের মানুষকে তিনি একত্র করতে পারতেন। বাংলাদেশের বহু স্বনামধন্য মানুষ, যাদের কেউ কেউ ছিলেন তার চেয়েও বয়োজ্যেষ্ঠ, তারা তার সঙ্গে
কাজ করতে গেলে স্বাচ্ছন্দে তার নেতৃত্ব মেনে নিতেন“।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের অকাল প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, যে কোনো ফোরামেই তাঁর উপস্থিতি আমাদের আত্মবিশ্বাস জাগাতো। তার ইতিবাচক নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিতো বাংলাদেশে জন্য অধিকতর ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। তাঁর মতো একজন দেশপ্রেমিক, জ্ঞানী ও অবিচল ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল আরো দীর্ঘ সময়।”
কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছেতেই পৃথিবীর সফর তাঁর দীর্ঘ হয়নি। বিদেশ সফরে থেকেও বন্ধুবর অপর গুণী প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরীকে দেশের টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা নিয়ে একটি মেইল পাঠিয়ে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। কিন্তু তিনি এখনো জীবিত আছেন তার কর্মে; সতীর্থ-অনুজদের শ্রদ্ধা ও ভালোবসায়। রাষ্ট্রীয় ভাবে না হলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগেই প্রতিবছর তাঁকে স্মরণ করা হয় নানা উপমায়। দোআ-আলোচনায়। একান্ত ব্যক্তিগত আয়োজনে। সময়ের পিঠে সময় ছুটে চলে। কিন্তু সেই ঘোড়ার টগবগে ধ্বনি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। নতুন প্রজন্মের কাছে তা আজ কতটুকুইবা পৌঁছছে। তাদের আহঙ্কারের বাক্সে কিংবা পাঠে কিন্তু এখনো তাকে উপস্থাপন করা হয়নি যোগ্যতার নিরিখে। তাইতো ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র সর্বজনবিদিত উক্তি- ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না’ বাক্যটি গভীর রজনীর মতো ঢং ঢং করে বাজে।







